শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

মানসিকতার রদবদল চাই

॥ এস এম আবদুচ ছালাম আজাদ ॥

ক্ষমতায় আরোহণ করার বৈচিত্রময় অভিজ্ঞতা যেমন আছে তেমনি লজ্জা ও অপমানের সাথে ক্ষমতার মসনদ ত্যাগ করার ন্যক্কারজনক অভিজ্ঞতাও এ দেশের মানুষের আছে। ৩৬ জুলাই ২০২৪ তো সরকারের সর্বোচ্চ পদ ছেড়ে তথাকথিত গণতন্ত্রের মানস কন্যা খ্যাত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নেওয়ার অভিজ্ঞতাটাও নতুন করে সঞ্চয় হলো। এই তো কয়েক বছর আগে আরব বসন্তের নবদোলায় দোলছিল সারা দুনিয়া । দেখা গেলো স্বৈরাচার এবং ফ্যাসিস্টদের করুণ ভয়ার্ত চেহারার সে এক নয়া দৃশ্য। শোনা গেলো এক করুণ আর্তনাদ। সদ্য সিরিয়ার স্বৈরাচারী আসাদ সরকারের ন্যক্কারজনক বিদায়ও দেখা হলো। এর আগে শ্রীলঙ্কার স্বৈরাচারী সরকারের লজ্জাজনক বিদায়ের দৃশ্য দেখেছে সারা বিশ্ব। আফগানীদের উপর চেপে বসা দখলদারদের পালিয়ে বাঁচার দৃশ্যও নতুন নয়। গণতন্ত্র যে দেশে প্র্যাক্টিজ হয় সে দেশে ক্ষমতার হাতবদল কিংবা পালাবদল হয়। ক্ষমতার পালাবদলের বিষয়টি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। গণতান্ত্রিক দেশে নির্দ্দিষ্ট সময়ে জনমতের ভিত্তিতে ক্ষমতার পালাবদল হবে।

কেউ ক্ষমতায় আসবে কেউ ক্ষমতা থেকে বিদায় নেবে। পরবর্তীতে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়া দল আবারো ক্ষমতায় আসবে। ঢাকঢোল পিটিয়ে যে দল ক্ষমতায় আসে সে দল আবারো বিদায় নেয়। গণতন্ত্র বুঝে গণতন্ত্র মেনে নিলে ক্ষমতার এই পালাবদলের স্বভাবিক প্রক্রিয়াকে হাসিমুখে মেনে নিতে পারে। যারা শুধুমাত্র ক্ষমতার রাজনীতি করে বা ক্ষমতার মালিকানা দাবী করে তারা মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও বাস্তবে সাধারণ প্রক্রিয়াকে মেনে নিতে পারে না। রাজনৈতিক মানসিকতায় তারা অসুস্থ প্রকৃতির রাজনৈতিক জনশক্তি। এই শক্তির নিকট দেশ, জাতি, দেশের গণতন্ত্র, অর্থনীতি, রাজনৈতিক পরিবেশ, শিক্ষা ব্যবস্থা, পেশাদারিত্বসহ কোন কিছুই নিরাপদ নয়। তাদের মানসিকতা হলো আমরা ক্ষমতার মালিক। ক্ষমতার চেয়ারে বসার একক মালিকানার দাবীদার। জনগণ কেবল তাদের জিন্দাবাদ দেবে। তাদের পেছনে পেছনে হাঁটবো। কোন শান্তি পাবে না। নিরাপত্তা পাবে না। তাদের ছেলে-মেয়ে আত্মীয় স্বজন দেশে বিশেষ নিরাপত্তায় পড়াশোনা করবে। ব্যবসা-বাণিজ্য করবে। রাষ্ট্রের যাবতীয় সুযোগ সুবিধা ব্যবহার করে চলবে। আর জনগণ কেবল ফরমায়েশ খাটবে। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি স্বাধীন হবার পর হতে এমন অসুস্থ চিত্রই গোটা জাতি দেখে আসছে। দীর্ঘ ১৬ বছরের নিরবচ্ছিন্ন আওয়ামী লীগের অপশাসন, জুলুম-নিপীড়ন, একক কর্তৃত্ব ও লুটপাট, গুম-হত্যা, বিচারিক হত্যা, বিডিআর হত্যা, হেফাজাত হত্যা, ক্রসফায়ারে হত্যা, কুপিয়ে হত্যা, পিটিয়ে হত্যা, পুড়িয়ে হত্যা, ভোট ডাকাতি, ব্যাংক ডাকাতি, রিলিফ ডাকাতি, টে-ার ডাকাতি, জমি ডাকাতি, বাগান ডাকাতি, দোকান ডাকাতি, ইতিহাস চুরি, তথ্য চুরি, ফাইল চুরি, ধর্ষণ, ধর্ষণের সেঞ্চুরি, শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধ্বংসসহ দুঃশাসনের ও দুর্নীতির এমন কোন কাজ নেই যা দেখা যায়নি। বিগত ১৬ বছর ছিল অসুস্থ রাজনীতির এক ভয়ঙ্কর চিত্র। যা কারো কাম্য ছিলো না। তবুও জনগণকে দেখতে হয়েছে জোর করে ক্ষমতা দখলকারীর ভয়াবহ নগ্ন দাপট ।

চব্বিশের রক্তাক্ত আন্দোলনের ধাক্কায় রং হেডেড লেডি খ্যাত হাসিনা পালিয়ে গিয়ে ক্ষমতা ছাড়লেও দেশের প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে হাসিনার তাঁবেদাররা বসে আছে দিব্যি আরামে। ব্যবহার করে যাচ্ছে সরকারী সকল সুযোগ-সুবিধা এবং প্রতিমাসে আদায় করে নিচ্ছে সরকারী বেতন। সাথে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী ফ্যাসিস্ট এর পক্ষে নানান ভাবে ষড়যন্ত্রের কলকাঠি নেড়ে চলছে। অপরদিকে একদল মানুষ রাজনৈতিক পরিচয় বহন করে নতুনভাবে দুর্নীতি দুঃশাসনের নতুন পরিবেশ তৈরীর মহা স্বপ্ন নিয়ে হৈ চৈ করছে। তারা ক্ষুধার্ত হিসেবে জনগণের কাছে পরিচিতি লাভ করে চলছে। জনগণ চায় সুশাসন ও সুনীতি। আর রাজনৈতিক ডাকাতেরা চায় দুঃশাসন ও দুর্নীতি। ছত্রিশ জুলাইয়ের ভয়াবহ ও রক্তাক্ত ছাত্র আন্দোলনের পর জনগণ ভাবছিল রাজনৈতিক নেতাদের নীতি ও নৈতিকতায় দেখার মতো পরিবর্তন হয়তো আসবে। প্রশাসনের চেয়ারে বসা মানুষগুলোর নীতি ও নৈতিকতায় অন্তত কিছুটা পরিবর্তন আসবে। অথচ জনগণ যেটা দেখতে পাচ্ছে তা আরো ভয়াবহ।

পুলিশ প্রশাসন ইচ্ছে করে নেতিয়ে পড়ার ভাব দেখাচ্ছে। মামলা মোকদ্দমা নেয়া, অপরাধী গ্রেপ্তার এসব বিষয়ে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ফ্যাসিস্ট আমলে যথেষ্ট মামলা-মোকদ্দমা হয়েছে। ঢাকঢোল পিটিয়ে, জনগণকে জিম্মি করে প্রকাশ্যে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য করেছে। বর্তমানে মামলা মোকদ্দমার প্রতি আগ্রহ না দেখালেও নিরবে নিবৃতে লাখ টাকার বাণিজ্য করে চলছে। টেন্ডার ডাকাতদের দৌরাত্ম্য কিঞ্চিৎ পরিমাণও কমেনি। তারা বহাল তবিয়তে পর্সেনটেইজ বাণিজ্য করেই যাচ্ছে। মূলকথা হলো রক্তাক্ত বিপ্লব সংঘটিত হলেও মানুষের নীতি নৈতিকতায় কোন ধরনের পরিবর্তন আসেনি। গতানুগতিক রাজনীতির ধারায় কোন পরিবর্তন আসেনি। সময় শেষে এই বিপ্লবী সরকার বিদায় নেবে। আরেকটা নতুন সরকার আসবে। তারাও ক্ষমতায় গিয়ে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করবে। আবার শুরু হবে নতুন স্বৈরশাসন। এভাবে ক্ষমতার পালাবদল হবে। কিন্তু দেশে কোনরকম শান্তি আসবে না। দেশ ও জনগণের মাঝে শান্তির সুবাতাস বইয়ে দিতে হলে ক্ষমতার পালাবদল নয় মানসিকতার রদবদল হতে হবে। যা রক্তাক্ত বিপ্লবের পরও দেখা যাচ্ছে না।

জনগণ নতুন কোন ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরচার চায় না। যেনতেন ভাবে কোনরকম ক্ষমতার পালাবদল চাই না। চাই মানসিকতার পরিচ্ছন্ন পরিবর্তন।দেশ ও জাতির কাম্য নয় নব্য কোন স্বৈরচার ও ফ্যাসিস্টের আগমন। সরকার পরিচালনার নামে নাগরিক সমাজের উপর কোনরকম জুলুম নিপীড়ন। জনগণ চায় না কোনরকম লুঠতরাজ ও খুন রাহাজানি। জাতির মন মানসিকতার পরিবর্তন যেমন প্রয়োজন তেমনি নৈতিক অবস্থার পরিবর্তনও সময়ের দাবী। যারা নতুন করে ক্ষমতায় যাবে তাদের মন মানসিকতার পরিবর্তন যেমন প্রয়োজন তেমনি জনগণের মানসিকতায়ও পরিবর্তন আসা জরুরী। সব মিলিয়ে বলবো ক্ষমতার পালাবদল নয় মানসিকতার পরিবর্তনই বেশি প্রয়োজন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ